Header Ads Widget

Responsive Advertisement

পুরান ঢাকার যত দর্শনীয় স্থান

-পুরান ঢাকার জানা-অজানা তথ্য 

১৬১০ খ্রীষ্টাব্দে ইসলাম খাঁ চিশতি বাংলার রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন এবং সম্রাটের নামানুসারে এর নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর। প্রশাসনিকভাবে জাহাঙ্গীরনগর নামকরণ হলেও সাধারণ মানুষের মুখে ঢাকা নামটিই থেকে যায়। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন দিয়ে শুরু হয়ে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের ফসল হিসেবে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীনতা লাভের অনেক আগ থেকেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাজধানীর ন্যায় এই ঢাকাতেও ছিল অনেক ঐতিহাসিক দর্শনীয় স্থান। আর এই নিবন্ধনে পুরানো ঢাকার সেই সমস্ত দর্শনীয় স্থান গুলোর ব্যাপারেই লেখা হয়েছে যা আজ অব্দি স্বমহিমায় দাঁড়িয়ে আছে।

বাংলার রাজধানী রাজমহল

পুরানো ঢাকার অন্যতম ঐতিহাসিক স্থান বাহাদুর শাহ পার্ক। এর অবস্থান সদরঘাটের সন্নিকটে যার পশ্চিমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এবং উত্তর পশ্চিমে জেলা আদালত অবস্থিত। পূর্বে এর নাম ছিল ভিক্টোরিয়া পার্ক। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবে শহীদ বীরদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে বাহাদুর শাহ্ জাফরের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় বাহাদুর শাহ পার্ক।

বাহাদুর শাহ পার্ক

রাজধানীর পুরান ঢাকার ওয়ারীতে অবস্থিত ওপর একটি ঐতিহাসিক স্থান বলধা গার্ডেন। জানা যায় বলধার জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী ৩.৩৮ একর জমির ওপর ১৯০৯ সালে এই উদ্যানটি নির্মাণের কাজ আরম্ভ করেন। যার নির্মাণ কাজ শেষ হতে সময় লেগেছিলো প্রায় ৮ বছর। বিরল প্রজাতির ৮০০টি  গাছসহ বাগানটিতে প্রায় ১৮ হাজার গাছ রয়েছে। তবে বর্তমানে এখানে ৬৭০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। বাগানটিতে এমনও অনেক প্রজাতির গাছ রয়েছে, যা বাংলাদেশের অন্য কোথাও নেই। সপ্তাহের প্রতিদিনই এটি সকাল ৮টা থেকে ১১টা এবং ২টা থেকে ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে।

বলধা গার্ডেন

আমরা মেডইন জিনজিরা বললে অনেকেই চিনি কিন্তু জিনজিরা প্রাসাদ সম্পর্কে কয়জনই বা জানি?? যাইহোক, পুরান ঢাকার বড় কাটরার দক্ষিণ পাশে বুড়িগঙ্গা নদীর অপর তীরে জিনজিরা প্রাসাদ অবস্থিত। মুঘল সুবাদার দ্বিতীয় ইব্রাহিম খান তার প্রমোদ কেন্দ্র হিসেবে জিনজিরা প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর ঘসেটি বেগম, আমেনা বেগম, সিরাজউদ্দৌলার স্ত্রী লুত্ফুন্নেছা বেগম এবং তার কন্যাকে জিনজিরা প্রাসাদে এনে বন্দী রাখা হয়।

জিনজিরা প্রাসাদ

দর্শক বন্ধুদের মধ্যে আহসান মঞ্জিলের নাম শুনেননি এমন কেউ হয়তো বা নেই তবে অনেকর'ই  হয়তো জানা নেই এই আহসান মঞ্জিলের অবস্থান সম্পর্কে। বুড়িগঙ্গা নদীর পাড় ঘেঁষে কুমারটুলি এলাকায় এই আহসান মঞ্জিলের অবস্থান। অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে শেখ ইনায়েত উল্লাহ আহসান মঞ্জিলের বর্তমান স্থানে রংমহল নামের একটি প্রমোদ ভবন নির্মাণ করেন। পরে বিভিন্ন হাতঘুরে তা নবাব আব্দুল গনির হাতে আসে। নবাব আব্দুল গনি ভবনটিকে পূণনির্মাণ করেন, ১৮৫৯ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ১৮৭২ সালে এর পূণনির্মাণের কাজ শেষ হয়। নিজের ছেলে খাজা আহসান উল্লাহর নামে ‘আহসান মঞ্জিল’নামটি রাখেন তিনি। পরে এ বাড়িতে নবাব আহসান উল্লাহ বাস করতেন।


চকবাজারের দক্ষিণে বুড়িগঙ্গার দিকে মুখ করে নির্মিত বড়কাটরা নামক ইমারত টি পুরানো ঢাকার আরেকটি ঐতিহাসিক স্থান। ১৬৪৪ সালে দেওয়ান আবুল কাশেম কাটরাটি শাহ সুজার বাসস্থান হিসেবে নির্মাণ করেন। তবে শাহ সুজা কখনোই এই কাটরাটিতে বাস করেননি। মুসাফির, পথিক ও আশ্রয়হীনদের সরাইখানা বা লঙ্গরখানা হিসেবে ব্যবহার হয়েছে বড়কাটরা।

বড়কাটরা

অপর দিকে বড়কাটরা থেকে ১৮২.২৭মিটার পুবে অন্য আর একটি ইমারতের অবস্থান ছিল, যা অনেকেই ছোটকাটরার নামে জানেন। ধারনা করা হয় ১৬৬২ অথবা ১৬৭১ সালে শায়েস্তা খাঁ এটি নির্মাণ করেন। তবে বর্তমানে এটি বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের দখলে চলে গেছে, হয়ে গেছে অস্তিতহীন। 

ছোটকাটরার

তবে ছোটকাটরা অস্তিতহীন হয়ে গেলেও স্বমহিমায় আজও দাঁঢ়িয়ে আছে পুরনো ঢাকার গোপীবাগ এলাকায় রোজ গার্ডেন। তৎকালীন নব্য জমিদার ঋষিকেশ দাস বিশ শতকের তৃতীয় দশকে (সম্ভবত ১৯৩০ সালে) গড়ে তোলেন এ গার্ডেন। বলধার জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর বাগান-বাড়ির আদলে নির্মিত হয়েছিল রোজ গার্ডেন। তৎকালীন উচ্চবিত্ত হিন্দু সমাজের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল বলধা জমিদারের বাড়ি। একদিন বিনা আমন্ত্রণে ঋষিকেশ গিয়েছিলেন বলধার এক জলসায়। কিন্তু ঋষিকেশ দাস সনাতনী ধর্মে নিম্নবর্ণ হওয়ায় তাকে সেখানে অপমাণিত হতে হয়। তারপরই নির্মাণ করেন রোজ গার্ডেন। রোজ গার্ডেনটি ছিল ২২ বিঘা জমির ওপর। তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের দুলর্ভ সব গোলাপ গাছে সুশোভিত করেছিলেন এ উদ্যানটি।

রোজ গার্ডেন

পুরানো ঢাকার দর্শনীয় স্থান গুলির মধ্যে উনবিংশ শতকে নির্মিত ঐতিহাসিক  একটি ভবন রূপলাল হাউজ। এটি বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর পারে ফরাসগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত। ভবনটি নির্মাণ করেন হিন্দু ব্যবসায়ী ভ্রাতৃদ্বয় রুপলাল দাস ও রঘুনাথ দাস। দ্বিতল এই ভবনের স্থাপত্য শৈলী অভিনব। ভবনটিতে ৫০টির অধিক কক্ষ রয়েছে, এবং কয়েকটি প্রশস্ত দরবার কক্ষ রয়েছে।

রূপলাল হাউজ

এই বুড়িগঙ্গা নদীর উত্তর পারে ফরাসগঞ্জ এলাকায়ই অবস্থিত নর্থব্রুক হল নামে পরিচিত লালকুঠি। প্রচলিত আছে লালকুঠির গোটা ইমারতটি লাল রঙে রঙিন বলে এর নাম হয়েছে লালকুঠি। ৯০৪ খ্রীস্টাব্দে ১৬ অক্টোবর ঢাকার নতুন রাজস্ব ও ডাক অফিস খোলার জন্য ওই দিনেই ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য খাজা মোহাম্মদ ইউসুফের উদ্যোগে নর্থব্রুক হলে একটি বড় সভা করা হয়। শহরের গণ্যমান্য মুসলমান ও ইউরোপিয়দের এতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সভায় ব্রিটিশ সরকারকে নতুন প্রদেশ গঠন ও ঢাকায় রাজধানী করার জন্য ধন্যবাদ ও সন্তোষ প্রকাশ করা হয়। এ ধরনের নানা ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে এই নর্থব্রুক হল।

নর্থব্রুক হল

পুরানো ঢাকার দর্শনীয় স্থান গুলির মধ্যে অন্যতম আর একটি স্থান হলো তারা মসজিদ। বিখ্যাত এই তারা মসজিদটি পুরান ঢাকার আর্মানিটোলায় অবস্থিত। মসজিদটির সারা গায়ে রয়েছে শত শত ছোট বড় তারার কারুকাজ। সাদা সিমেন্টের ওপর চিনামাটির তারকাকৃতি টুকরো বসিয়ে করা হয়েছে এই তারকাসজ্জা। আঠারশ শতকে ঢাকার জমিদার মির্জা গোলাম মসজিদটি নির্মাণ করেন। 

তারা মসজিদ

পুরান ঢাকার এই আরমানিটোলায় রয়েছে আর্মেনীয়দের তৈরি আর্মেনীয় গির্জা। আরমানিটোলায় এক সময় বিপুলসংখ্যক আর্মেনীয় নাগরিকের বসবাস ছিল। আর্মেনীয়দের বসবাসের কারণেই ওই এলাকার নামকরণ হয় আরমানিটোলা বা আর্মেনিয়ান স্ট্রিট। মূলত সম্রাট আকবরের অনুমতি সাপেক্ষে আর্মেনীয়রা ভারতে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা, বসতি স্থাপন ও গির্জা নির্মাণ করে। ব্যবসার কারণে এক সময় ঢাকায় আর্মেনীয়দের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে তারা আরমানিটোলায় বসতি স্থাপন ও একটি ক্ষুদ্র গির্জা স্থপন করে প্রার্থনা করত এবং তাদের কারও মৃত্যু হলে তেজগাঁও রোমান ক্যাথলিক গির্জার পাশে মরদেহ সমাহিত করত।

আর্মেনীয় গির্জা

প্রিয় পাঠক, লালবাগ কেল্লা নামটি আমাদের সবার কাছেই বেশ পরিচিত। মোগল আমলের স্থাপত্যকীর্তির অন্যতম হচ্ছে লালবাগের কেল্লা। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষার্ধে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের তৃতীয় পুত্র মোহাম্মদ আজমের সময়ে নির্মিত এ কেল্লায় রয়েছে পরীবিবির সমাধি, দরবার গৃহ, হাম্মামখানা, মসজিদ, দুর্গ ইত্যাদি। বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে লালবাগ মহল্লায় এর অবস্থান। সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র আজম ১৬৭৮ সালে এর নির্মাণ কাজ শুরু করেন এবং নবাব শায়েস্তা খানের আমলেও  এর নির্মাণ কাজ অব্যাহত ছিল।

লালবাগ কেল্লা

লালবাগ কেল্লা থেকে ৩০০ মিটার উত্তরপূর্বে রয়েছে সুন্দর একটি মন্দির যার নাম ঢাকেশ্বরী মন্দির। ঢাকার সবচেয়ে প্রচীন এ মন্দিরে নির্মাণকাল ও নামকরণ নিয়ে রয়েছে যথেষ্ট বিতর্ক। কিংবদন্তি তথ্য অনুসারে একবার রাজা বিজয় সেনের রানি লাঙ্গলবন্দে স্নানে গিয়েছিলেন। স্নান শেষে ফেরার পথে তার একটি পুত্রসন্তান জন্মে ছিল, ইতিহাসে যিনি বল্লাল সেন নামে পরিচিত। বল্লাল সেন সিংহাসনে আরোহণের পর নিজের জন্মস্থানকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য নির্মাণ করেছিলেন এই মন্দির।

ঢাকেশ্বরী মন্দির।

রাজধানী ঢাকায় রয়েছে লাল রঙের দৃষ্টিনন্দন একটি স্থাপত্য, যা যে কারও নজর কাড়তে দ্বিধা করে না, আর সে স্থাপত্যটি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থিত কার্জন হল। ভিক্টোরীয় স্থাপত্যরীতি, মোগল স্থাপত্যশৈলী ও বাংলার স্বতন্ত্র সংবেদনশীল বৈশিষ্ট্য নিয়ে তৈরি এ ভবনটি । ১১৩ বছর ধরে ঢাকার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থাপত্য আর কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই কার্জন হল। কার্জন হল বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও জীব বিজ্ঞান অনুষদের কিছু শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষার হল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বাংলায় মোগল আমলের আর একটি ঐতিহাসিক স্থাপনার রয়েছে পরিবিবির মাজার। সম্রাট আওরঙ্গজেবের ৩য় পুত্র আযম শাহ ১৬৭৮ সালে এর নির্মান কাজ শুরু করেন। কিন্তু দূ্র্গের কাজে হাত দেবার ১বছরের মাথায় মারাঠা বিদ্রোহ শুরু হয়, আর এর ফলে আওরঙ্গজেব পুত্রকে দিল্লি ডেকে পাঠান।এরপর ১৬৮০ সালে অসম্পূর্ণ কাজে হাতে দেন সুবেদার শায়েস্তা খান। এর মধ্যে ১৬৮৪ সালে শায়েস্তা খানের কন্যা পরীবিবি মারা গেলে তিনি দূর্গকে অপয়া মনে করে এর নির্মাণ কাজ স্থগিত করেন। এর পর থেকে এটি পরিবিবির মাজার হিসাবে সকলের কাছে পরিচিত।

পরিবিবির মাজার

তো প্রিয় পাঠক বন্ধু, পুরান ঢাকার দর্শনীয় স্থান গুলো সম্পর্কে আপনার মন্তব্য জানাতে ভুলবেন না ! এতক্ষণ সাথে থাকার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ…আল্লাহাফেজ!!


Post a Comment

0 Comments