Header Ads Widget

Responsive Advertisement

পাহাড়ের গায়ে আগুন

 ৪ হাজার বছর ধরে যে মাটিতে এখনো জ্বলছে আগুন

আর্মেনিয়া, ইরান এবং রাশিয়ার মধ্যবর্তী একটি দেশ আজারবাইজান। দেশটির বিভিন্ন এলাকার মাটিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে আগুন জ্বলার ঘটনা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক একটি ঘটনা। প্রায় ৪ হাজার বছর ধরে এই অঞ্চলে জ্বলছে আগুন। বৃষ্টি, বাতাস, এমনকি বরফেও কখনো নেভেনি এই আগুন। হাজার বছর ধরে জ্বলতে থাকা এই অগ্নিভূমি নিয়ে আজকের নিবন্ধনটি।

ইয়ানার ড্যাগ

আজারবাইজান নামের উৎপত্তিঃ

আজারবাইজানের প্রাচীন পার্সিয়ান নাম ‘অতুরপাতাকান’-এর অর্থ ‘যে ভূমিতে আগুন জমা আছে’। বর্তমানে ‘আজার’-এর পার্সিয়ান অর্থ দাঁড়ায় ‘আগুন’। প্রাচীন গ্রিকদের বিশ্বাস ছিল, দেবতার কাছ থেকে আগুন চুরি করে ককেশাস পর্বতে নিয়ে রেখেছিলেন প্রমিথিউস। আর সে কারণে জিউস তাকে বেঁধে রাখেন। পৌরাণিক সেই গল্প থেকেই মূলত আজারবাইজান নামটি এসেছে।

আজারবাইজানের পাহাড়ের গায়ে আগুনঃ

পাহাড়ের গায়ে আগুন জ্বলছে এমন একটি দৃশ্য নিঃসন্দেহে সব দর্শকের জন্যই আগ্রহের একটি বিষয়। দিনের বেলা আগুনের এই রূপ ভালো করে বোঝা না গেলেও রাতে কিংবা শীতের সময় প্রকৃতির এই রহস্য দেখতে সবচেয়ে সুন্দর লাগে। রাতের বেলায় ঘন অন্ধকারের মধ্যে যখন শুধু পাহাড়ের গায়ে আগুন জ্বলতে থাকে তখনই এর আসল রূপ চোখে পড়ে। আর শীতের সময় শ্বেতশুভ্র তুষার যখন মাটি না ছুঁয়েই ধোঁয়ার সঙ্গে বাতাসে মিশে যায়, সেই দৃশ্যও মন ছুঁয়ে যায় প্রতিটি দর্শনার্থীর।

প্রায় চার হাজার বছর ধরে আজারবাইজানের বিভিন্ন এলাকায় জ্বলছে আগুন। মূলত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং তেলসমৃদ্ধ দেশটির অনেক স্থানেই এই ধরনের আগুনের দেখা মেলে।

এক সময় দেশটিতে এই ধরনের জ্বলন্ত আগুনের ঘটনা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। মাঝেমাঝে এটি বেশ মারাত্মক আকার ধারণ করে। কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উত্তোলনের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় ধীরে ধীরে আগুনের ঘটনা বেশ কমে এসেছে। এখনো টিকে থাকা এই ধরনের আগুনগুলোরই একটি হলো ‘ইয়ানার ড্যাগ’। 

অনেকেই দাবি করেন, ইয়ানার ডাগে এমন একটি স্থান রয়েছে যেখানে নিরবচ্ছিন্নভাবে আগুন জ্বলছে ১৯৫০ সাল থেকে। এই আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে রয়েছে একটি  প্রচলিত গল্প। বলা হয়ে থাকে, পাহাড়ি এলাকা বলে ওই স্থানে অনেক রাখালই মেষ চড়াতে আসতেন। তাদের মাঝেই কোনো একজন রাখাল না বুঝে অল্প জ্বলতে থাকা আগুনের মাঝে একটি ম্যাচের টুকরো ফেলে দেন। আর তারপর থেকেই এই আগুনের পরিমাণ বেড়ে যায়। মুষলধারে বৃষ্টি, তুষার ঝড় কিংবা বাতাস কোনো কিছুই নেভাতে পারেনি এই আগুন। সারা দিন ধরে আগুন জ্বলার কারণে আশপাশের এলাকাটির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি থাকে।

আজারবাইজানের অ্যাবশেরন উপদ্বীপে নিরন্তর জ্বলে চলা প্রাচীন পাহাড়ি এই  ইয়ানার ড্যাগ চিত্তাকর্ষক অগ্নিকুণ্ডটি তাইতো অনেক পর্যটককেই বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। প্রতিনিয়ত স্থানীয় এমনকি বহু বিদেশি পর্যটক আসে এটি দেখতে। প্রতি বছর এখানে গড়ে প্রায় ২৫ হাজার পর্যটক ভ্রমণে আসে। আজারবাইজান ভ্রমণে পর্যটকদের কাছে ভ্রমণ এরিয়ার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ এই ‘ইয়ানার ড্যাগ’।

যার অবস্থান আজারবাইজানের রাজধানী বাকু থেকে উত্তর দিকে মাত্র ৩০ মিনিটের দূরত্বে। চাইলে পাবলিক বাসে করেও সেখানে যাওয়া যায়, এছাড়াও রয়েছে মেট্রোরেলের ব্যাবস্থা । তবে ‘ইয়ানার ড্যাগ’ এর এই পুরো এলাকা জুড়ে শুধুমাত্র একটি ক্যাফে ছাড়া তেমন আর কিছুই নেই।

আগুন জ্বলার কারণ হিসাবে গবেষণা কি বলেঃ

গবেষণা বলে আজারবাইজানের ভূগর্ভস্থে রয়েছে তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি বড় আধার। রোমানীয় ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রায় আড়াই হাজার বছর আগেও তারা আজারবাইজানের এই উপদ্বীপ থেকে তেল উত্তোলন করেছিল। বাইজেন্টাইনদের মতে, পঞ্চম শতাব্দী থেকে শুরু করে আজ অবধি আজারবাইজানের ইয়ানার ডাগ জ্বলছে।

দর্শক গ্যাস স্টোভের মাধ্যমে আমরা যেভাবে আগুন জ্বালায় ঠিক একই ভাবে পাহাড়ের ভিতর থেকে বুদবুদ আকারের গ্যাস বের হচ্ছে এবং তা বাতাসের সংস্পর্শে এসে মাটির গায়ে জ্বলছে আগুন এমনি ধারণা গবেষকদের।  

তবে অগ্নিপূজারীরা বিশ্বাস করত, আগুন হচ্ছে মানুষ এবং অপার্থিব পৃথিবীর মাঝে যোগাযোগ রক্ষা করার একটি মাধ্যম। শুধু তাই নয়, আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি এবং জ্ঞান অর্জন করারও মাধ্যম এটি। এই আগুন শুদ্ধ, জীবন বাঁচিয়ে রাখে এবং পূজার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ইতিহাস অনুযায়ী, অগ্নিপূজারীদের জন্য ইয়ানার ডাগ খুবই একটি গুরুত্বপূর্ণ  জায়গা হলেও বর্তমানে দর্শনার্থীরা এখানে পূজার জন্য আসেন না। তারা আসেন শুধু প্রাচীন এই জায়গাটা ঘুরে দেখতে।

অগ্নি মন্দির "আতিশগহ"

আজারবাইজানের অগ্নিপূজার ইতিহাস অনেক দর্শনার্থী খুব আগ্রহ নিয়ে জানতে চান। ইতিহাসপ্রেমীরা তাই এখানে চলে আসেন। সেই অগ্নি ইতিহাস জানতে বাকুতে আছে ‘আতিশগহ অগ্নি মন্দির’। বাকু থেকে পশ্চিম দিকে সুরাখানি শহরে এই মন্দিরের অবস্থান।

পার্সিয়ান শিলালিপির ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই মন্দিরে হিন্দু, শিখ আর অগ্নিপূজারীরা উপাসনা করতেন। মন্দির অর্থাৎ পেন্টাগল (পঞ্চকোণী) কমপ্লেক্সটি তৈরি করা হয়েছিল ১৭ থেকে ১৮ শতকের দিকে। বাকুর ভারতীয় বাসিন্দারা এটি নির্মাণ করেন।

প্রাচীনকাল থেকেই তারা ভাবতেন, জায়গাটিতে তাদের ভগবান থাকেন। দশম শতক বা তারও আগে থেকে আগুনের পূজা হয়ে আসছিল। আতিশগহ নামটি এসেছে পার্সিয়ান শব্দ ‘আগুনের ঘর’ থেকে। এই কমপ্লেক্সের একটি বেদীতে প্রাকৃতিক গ্যাসযুক্ত একটি গম্বুজের ওপর আগুন জ্বালানো আছে। ১৯৬৯ সাল থেকে এই জায়গাতে প্রাকৃতিক গ্যাসের সাহায্যে আগুন জ্বলত। কিন্তু বর্তমানে এই আগুন জ্বলে বাকুর প্রধান গ্যাস সরবরাহ করার জায়গা থেকে। আর এটি শুধু দর্শনার্থীদের জন্য। মন্দিরে অগ্নিপূজারীদের নিয়ম মানা হলেও ইতিহাস মতে, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় হিসেবেই এটির ব্যবহার ছিল।

রঙিন আজারবাইজান:

আকাশ থেকে নিচের দিকে তাকালে যদি দেখতে পান আকাশ ছোঁয়া একটি ভবনে লাল, নীল, কমলা এক কথায় রঙিন আলো শোভা পাচ্ছে তখন বুঝবেন আপনি আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে পৌঁছে গেছেন। শহরটির অনেক মানুষের কাছে উঁচু দালানের দেখা পাওয়া মানেই বাড়ি ফিরে আসা। সুউচ্চ এই ভবনটির নাম ‘ফ্লেম টাওয়ার’। শহরের প্রায় সব জায়গা থেকেই এই ভবনটি দেখা যায়। আর রাত হলে যেন মনে হয় শহরে প্রাণ ফিরে এসেছে।

আজারবাইজানকে বলা হয় ‘এ ল্যান্ড অব ম্যাজিক কালার্স’। এর অর্থ ‘জাদুর রঙের দেশ’। এই সিগন্যালটি  মূলত দেয় দেশটির পর্যটন বিভাগ। বিশ্ববাসীর কাছে রঙিন এই শহরটি বেশ সুপরিচিত।

প্রিয় পাঠক, "পাহাড়ের গায়ে আগুন" এই নিবন্ধনটি এ পর্যন্তই!! আজারবাইজান দেশটি সম্পর্কে আরও জানতে পড়ুন আমাদের ব্লগ এ লেখা অপর একটি নিবন্ধন...ধন্যবাদ!!

Post a Comment

0 Comments