-আজারবাইজান ভ্রমন ।। দেশ পরিচিতি ।। জানা-অজানা তথ্য !!
নদ-নদী,সাগর আর পাহাড়-পর্বত সবুজে ঘেরা দেশ আজারবাইজান! আজারবাইজানের সরকারি নাম রিপাবলিক অব আজারবাইজান । ককেশীয় অঞ্চলের এই দেশটির অবস্থান পূর্ব ইউরোপ ও পশ্চিম এশিয়ার একেবারে সীমান্ত বরাবার । আয়তন ও জনসংখ্যার দিকে থেকে এটি ককেশীয় রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বৃহত্তম। দেশটির উত্তরে রাশিয়া, পূর্বে কাস্পিয়ান সাগর, দক্ষিণে ইরান, পশ্চিমে আর্মেনিয়া, উত্তর-পশ্চিমে জর্জিয়া। এছাড়াও ছিটমহল নাখশিভানের মাধ্যমে তুরস্কের সাথে আজারবাইজানের রয়েছে একচিলতে সীমান্ত।
দেশটিতে রয়েছে তেল, গ্যাস ও লোহার মতো মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। তবে তেলশিল্পের ওপরই দেশটির অর্থনীতি বিশেষ ভাবে নির্ভরশীল। আজারবাইজানের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর বাকু! রাজধানী বাকুর তেলক্ষেত্রগুলো বিশ্বের অন্যতম সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্র হিসাবে গণ্য।
তো প্রিয় প্যাঠক বন্ধু, এই নিবন্ধনে আমরা জানতে চলেছি, এশিয়া মহাদেশের একটি সমৃদ্ধ মুসলিম রাষ্ট্র আজারবাইজান দেশটি সম্পর্কে জানা অজানা নানা তথ্য। আপনি চাইলে এই তথ্য গুলো YouTube থেকে ভিডিও আকারে দেখতে পারেন।
৮৬,৬০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশ আজারবাইজান। যা প্রায় পর্তুগাল বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেইন যে অঙ্গরাজ্য রয়েছে তার সমান। এছাড়াও তিনটি ককেশীয় রাষ্ট্রের মধ্যে আয়তনের দিক দিয়ে আজারবাইজান সবচেয়ে বৃহত্তম রাষ্ট্র।
আজারবাইজানের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলই পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত। সে দেশের সর্বোচ্চ উচ্চ ভূমি বৃহত্তর ককেশাস অঞ্চলটি উত্তরে রাশিয়ার সীমান্তে অবস্থিত এবং দক্ষিণ-পূর্ব দিকে কাস্পিয়ান সাগরের আবসেরন উপদ্বীপের দিকে বিস্তৃত হয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ বাজারদিউজে দাগি, যার উচ্চতা ৪,৪৮৫ মিটার, এবং এটি আজারবাইজান-রাশিয়া সীমান্তের কাছে অবস্থিত।
আজারবাইজানের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের একটি এলাকা নাগোর্নো-কারাবাখ, যা মূলত একটি বিতর্কিত এলাকা। আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজানের মধ্যে বিরোধের কেন্দ্রে আছে এই বিতর্কিত নাগোর্নো-কারাবাখ অঞ্চলটি। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্ত অনুযায়ী এটি আজারবাইজানের অংশ, তবে সেখানে থাকে মূলত জাতিগত আর্মেনিয়ানরা। যার ফলে নিয়মিতই এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে চলছে দ্বন্দ।
১৮ ও ১৯শ শতকে ককেশীয় এই দেশটি পর্যায়ক্রমে রুশ ও পারস্যদেশের শাসনাধীন ছিল। রুশ গৃহযুদ্ধকালীন সময়ে ১৯১৮ সালের ২৮শে মে তৎকালীন আজারবাইজানের উত্তর অংশটি একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কিন্তু মাত্র ২ বছরের মাথায় ১৯২০ সালে বলশেভিক লাল সেনারা আক্রমণ করলে এটি আবারও রুশ নিয়ন্ত্রণে আসে এবং ১৯২২ সালে দেশটি আন্তঃককেশীয় সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের অংশ হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৩৬ সালে আন্তঃককেশীয় সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রটি ভেঙে তিনটি আলাদা প্রজাতন্ত্র আজারবাইজান, জর্জিয়া ও আর্মেনিয়াতে রূপ নেয়। তখন থেকেই মূলত আজারবাইজানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং নাগোর্নো-কারাবাখ এলাকার খ্রিস্টান আর্মেনীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দের সূত্রপাত ঘটে।
যাইহোক, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা লাভ করা দেশ আজারবাইজানের বর্তমান জনসংখ্যা গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার এর তথ্য মতে, ১ কোটি ৩ লক্ষ ৫৩ হাজার ২৯৬ জন। যার ৯৬.৯ শতাংশই মুসলিম এবং এর মধ্যে ৮৫ শতাংশয় শী‘আ মুসলিম। তবে তাদরে আচার-ব্যাবহার বা চাল চলনে বুঝা যায় না যে তারা মুসলিম। এখাকার লোকেরা হারাম যে কোন খাবার গ্রহন করে অতি সহজে। এ অঞ্চলের মুসলিম এর চাইতে উজবেকি লোক অনেক ভাল বলা চলে।
আজারবাইজানি দেশটির সরকারী ভাষা, যা তুর্কি ভাষার একটি রুপ। এখানকার প্রায় ৯২ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা এই আজারবাইজানীয় ভাষায়, তবে এখানে আর্মেনিয়ান এবং রুশ ভাষারও প্রচলন রয়েছে।
ফার্সি ভাষা থেকে উৎপত্তি আজারবাইজান নামটির মূল অর্থ "অগ্নিভূমি''। এই অগ্নিভূমির সংস্কৃতি বেশ পুরনো। প্রাচীনকাল থেকে বছরের পর বছর ধরে যে রীতি চলে আসছে তার অনেকটাই তারা আজও নিজেদের মাঝে ধরে রেখেছেন।
এর মাঝে একটি হলো চা পরিবেশন। অতি প্রাচীনকাল থেকেই বাড়িতে মেহমান এলে তাদের প্রথম আপ্যায়নই থাকে চা। শুরুতেই অতিথিকে এক কাপ ব্ল্যাক টি-এর সঙ্গে একটি চিনির কিউব দেওয়া হয়। বলা হয়, অতীতে যে কোনো পানীয় পান করার আগে এই চিনির কিউব তাতে ফেলা হতো। বিশেষ করে যখন কোনো রাজ্যের শাসকের মধ্যে খাবারে বিষ দিয়ে মেরে ফেলতে পারে এমন আশঙ্কা কাজ করত। তখন পানীয়তে এই চিনির কিউব দেওয়ার পরীক্ষা শুরু হয়। যদি কিউবের রং বদলে যেত তাহলে বোঝা হতো তাতে বিষ মেশানো আছে। পুরনো সেই ধারা এখনো বিদ্যমান। তবে এখন মৃত্যুভয় থেকে নয়, শুধুমাত্র পরিবেশনার জন্যই এই পদ্ধতি মানা হয়।
আজারবাইজানের প্রাচীন সংস্কৃতির মাঝে উল্লেখযোগ্য আরেকটি হচ্ছে কার্পেট বোনা। এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে কার্পেট বোনার এই ধারা চলে আসছে। পুরুষেরা ভেড়ার শরীর থেকে পশম ছাড়ায় আর নারীরা সেই পশমকে শুকিয়ে বিভিন্ন প্রসেসের মাধ্যমে সুতা তৈরি ও সেই সুতার বুন দিয়ে সেলাই করে রং বে রঙের কার্পেট । প্রতিটি কার্পেটের বুনন শিল্প, নকশা আলাদা। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে প্রতিটি বুননের সাথে জড়িয়ে থাকে একটি করে গল্প।
আজারবাইজানের একটি ভিন্ন ও প্রাচীন প্রথা হল: বিয়ের রাতে বর কনের ঘরের বাইরে দুই পরিবারের সদস্যদের বাধ্যতামূলকভাবে উপস্থিত থাকতে হয়, যেন নববধূর কুমারীত্বের প্রমাণ করা যায়।
ফ্রিস্টাইল কুস্তি ঐতিহ্যগতভাবে আজারবাইজানের জাতীয় খেলা হিসাবে বিবেচিত হয়, তবে আজারবাইজানের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা হল ফুটবল এবং দাবা । অন্যান্য জনপ্রিয় খেলাগুলির মধ্যে রয়েছে, জিমন্যাস্টিকস, জুডো, ফুটসাল, ভারোত্তোলন এবং বক্সিং।
আজারবাইজানের সেরা দর্শনিয় স্থান গুলির মধ্যে রয়েছে, বাগচে জুক জাদুঘর,জ্বলন্ত পর্বত, মাটির আগ্নেয়গিরি এবং রাজধানী বাকু ছাড়াও, মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর মসজিদ সহ বেশ কিছু আকর্ষণীয় মসজিদ।
গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার সামরিক র্যাংকিয়ে ৩ লক্ষ রিজার্ভ সৈন্য ও ৬৫ হাজার এক্যটিভ সৈন্য সহ ১৪৫ দেশের মধ্যে আজারবাইজানের বর্তমান অবস্থান ৫৭ তম।
দেশটিতে শিক্ষার হার প্রায় ১০০ শতাংশ। এখানে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা বাধ্যতামূলক। দেশটির বেশিরভাগ মানুষই উচ্চশিক্ষিত। বাকু স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়, আজারবাইজানের প্রথম প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়, এটি ১৯১৯ সালে রাজধানী বাকুতে প্রতিষ্ঠিত হয়।
আজারবাইজানের অর্থনীতি বর্তমানে একটি সন্ধি পর্যায়ে বিদ্যমান, যেখানে সরকার এখনও একটি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করে চলেছে। দেশটিতে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ তেলের ভাণ্ডার। বৈচিত্রম্যয় জলবায়ু অঞ্চলের কারণে দেশটির কৃষি খাতের উন্নতির সম্ভাবনাও প্রচুর।
আজারবাইজানের সরকারী মুদ্রা নাম মানাত। ১ মানাত সমান প্রায় বাংলাদেশী ৫০ টাকা এবং ৪২.৩২ ভারতীয় রুপী। দেশটির মোট জিডিপি প্রায় $৪৫.২৮৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং মাথাপিছু আয় প্রায় $৪,৪৯৮ মার্কিন ডলার।
** আজারবাইজানের ডায়ালিং কোড হচ্ছে +৯৯৪ **


0 Comments