সর্বোচ্চ ভাষার দেশ নিউগিনি
১৯৭৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার নিকট থেকে স্বাধীনতা লাভ করা দেশ, পাপুয়া নিউগিনি । পাপুয়া নিউগিনি প্রশান্ত মহাসাগরের একটি দ্বীপ রাষ্ট্র । পাহাড়, নদী আর গহিন জঙ্গলের স্বাদ নিতে দেশটিতে প্রায় সারা বছর’ই পর্যটকদের ভিড় থাকে বলা চলে। পাপুয়া নিউ গিনিতে রয়েছে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি ভাষার ব্যাবহার।
প্রিয় পাঠক বন্ধু, আপনি ঠিকই ধরেছেন আজ আমরা প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ রাষ্ট্র পাপুয়া নিউগিনি সম্পর্কে জানা-অজানা অনেক তথ্যই জানবো এই নিবন্ধনে’র মাধ্যমে।।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানীর অধীনস্থ থাকা পাপুয়া নিউগিনি অস্ট্রেলিয়া দখল করে। এরপর ১৯৭৫ সালে দেশটি অস্ট্রেলিয়ার নিকট থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ রাষ্ট্র পাপুয়া নিউগিনির মোট আয়তন ৪ লাখ ৬২ হাজার ৮৪০ বর্গকিলোমিটার। যদিও ওশেনিয়া অঞ্চলের এই দেশটিতে প্রায় ৯৪ লাখের মত জনসংখ্যার বসবাস বলে দেশটির সরকারের দাবি তবে 2022 সালের ডিসেম্বরে করা এক রিপোর্ট অনুযায়ী দেশটির প্রকৃত জনসংখ্যা প্রায় 1 কোটি 70 লক্ষ কাছাকাছি ।। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপটির মানুষের সাথে আফ্রিকার গিনি অঞ্চলের মানুষের মিল থাকায় এর নাম দেয়া হয় নয়াগিনি বা নিউগিনি। শুধুমাত্র ইন্দোনেশিয়ার সাথে এই দেশটির রয়েছে ল্যান্ড বর্ডার এবং এর রাজধানী শহরটির নাম পোর্ট মোসাবি।
পৃথিবীর অন্যতম বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির দেশ পাপুয়া নিউগিনি তে রয়েছে বিশ্বের সর্বোচ্চ ভাষার ব্যাবহার। দেশটি তে প্রায় ৮৫০টিরও বেশি ভাষার ব্যাবহার রয়েছে বলে ধারণা। এর মধ্য ১১টি ভাষা বহুল প্রচলিত। তবে এরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য একটি মাত্র কৃত্রিম ভাষার ব্যাবহার করে, যার নাম পিজিন। যা ইংরেজির একটি সহজরুপ হিসেবে খ্যাত। এর পাশাপাশি দেশটির আরো দুটি সরকারি ভাষা হল হিরি মোতু ও ইংরেজি।
পাপুয়া নিউগিনির প্রধান ধর্ম খ্রিষ্টান এবং খুবই অল্প সংখ্যক মুসলিমদের বসবাস সেখানে। তবে ইসলামই পাপুয়া নিউগিনির সবচেয়ে দ্রুত সম্প্রসারণশীল ধর্ম। দেশটির মোট জনসংখ্যার মাত্র ১৩.২৫ শতাংশ লোকের বসবাস শহরে আর বাকি জনসংখ্যার অধিকাংশয় করে আদিম জীবনযাপন। দেশটির বেশিরভাগ জনগোষ্ঠী পাপুয়ান তবে কিছু সংখ্যক লোক সলোমন আইল্যান্ডের। জেনে আশ্চর্য হবেন, পাপুয়া নিউ গিনির এখনো এমন কিছু অঞ্চল আছে যেখানে এখনো মানুষের পা পড়েনি। এমন কি কিছু উপজাতি আছে যারা আজ পর্যন্ত বাইরের মানুষের সাথে যোগাযোগ'ই করে নি।
পাপুয়া নিউগিনির সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার বসবাস গ্রামে হওয়া এটি একটি কৃষি প্রধান দেশ। এখানকার বেশির ভাগ লোকেরা জীবিকা নির্বাহ করতে অর্থকরী ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি স্থানীয় বন থেকে ফলমূল ও বন্য পশুপাখি শিকার, কাঠ সংগ্রহ সহ স্থানীয় সামূদ্রিক লেক গুলো থেকে মাছ শিকার করে থাকে।
যায়হোক, ভিন্ন ভিন্ন ভাষার কারণেই পাপুয়া নিউগিনিতে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির সমাহার।
কমনওয়েলথ অফ নেশনস-এর সদস্য দেশ পাপুয়া নিউনিগিতে রাগবি, ক্রিকেট, ফুটবল, সফটবল, বাস্কেটবল এবং ভলিবল সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাগুলির অন্তর্ভুক্ত । তবে মহিলাদের জন্য নেটবল বেশি জনপ্রিয়। এছাড়া দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের লোকেরা ক্রিকেট খেলা কে জনপ্রিয়তার শীর্ষ অবস্থান দিয়েছে । 2000 সাল থেকে ঐতিহ্যবাহী ক্যানো এবং পালতোলা রেস একটি অভিজাত বিনোদন হিসেবে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তর এই দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে।
পাপুয়া নিউ গিনির প্রাণী বৈচিত্রও খুবই চমৎকার। এখানকার পাখি প্রজাতি খুবই বিচিত্র যা পৃথিবীর আর কোথাও খুজে পাওয়া কষ্টসাধ্য। বার্ডস অফ প্যারাডাইজ, রিবন টেইল্ড আস্ত্রাপিয়া,স্টেফিনির আস্ট্রাপিয়া,পাপুয়ান ঈগল, রেড সাতিনবার্ড ইত্যাদি। এদের মধ্যে বার্ডস অফ প্যারাডাইজ প্রজাতিটি সব থেকে চমৎকার। তাছাড়া এই অঞ্চলে দেখা মেলে নানারকম প্রজাতির বানর। তবে এখানের কিছু বিশেষ যায়গায় যেখানে ডাইনোসরের মত বৃহদাকার প্রাণী আছে বলে স্থানীয় লোকেদের ধারনা।
দেশটির রয়েছে বিভিন্ন জাতীয় উদ্যান এবং সংরক্ষিত এলাকা । দক্ষিণ উচ্চভূমির লেক কুতুবু ন্যাশনাল পার্ক সরীসৃপ, পাখি এবং প্রজাপতির আশ্রয়স্থল। মোরোবে প্রদেশের, ছোট ম্যাকঅ্যাডাম ন্যাশনাল পার্কে বার্ড-অফ-প্যারাডাইস, কাসকাস এবং ইচিডনা সহ অনেক বৈচিত্র্যময় প্রাণী রয়েছে। পোর্ট মোরেসবির কাছে ভারিরাটা ন্যাশনাল পার্ক এ- হাইকিং, ক্যাম্পিং, পাখি দেখা এবং পিকনিক করার সুযোগ দেয়। দ্বীপ অঞ্চল, এর প্রবাল প্রাচীর, অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় সামুদ্রিক জীবন, এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধরে সময় ডুবে যাওয়া- যুদ্ধ জাহাজ এবং বিমানের অসংখ্য ধ্বংসাবশেষ, বিশ্বের সেরা ডাইভিং এবং স্নরকেলিং প্রদান করে।
তবে পাপুয়া নিউগিনিতে ভ্রমনের ক্ষেত্রে একটু বেশিই সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়, কেননা এই দেশের কিছু দ্বীপ অঞ্চলে এখনো আদিম যুগের মত মানুষ খেকো মানুষের বসবাস রয়েছে । অবাক করার মত কথা হলেও এটায় সত্য । গত ২০১২ সালে ১৩ই জুলাই ইউ কে টেলিগ্রাফ নামক পত্রিকা সহ বেশ কিছু পত্রিকায় এ ব্যাপারে একটি নিউজ হয় । যেই নিউজে বলা হয় পাপুয়া নিউগিনির পুলিশ ২৯ জন মানুষ খেকো মানুষ কে আটক করে এবং যার মধ্য আট জন নারীও ছিলো।
আশ্চর্য জনক হলেও সত্য, পাপুয়া নিউগিনির সাড়ে চারশ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে থাকা দ্বীপপুঞ্জ ট্রোবায়ান্ড তে কুমারী মেয়েদের কখনো বিয়ে হয় না। বয়ঃসন্ধি শুরু হলেই তাদের থাকতে হয় গ্রামের অন্যান্য পুরুষদের সঙ্গে। তাদের কাছ থেকে শিখতে হয় যৌনজীবনের খুঁটিনাটি।
প্রিয় পাঠক, পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দ্বীপরাষ্ট্র পাপুয়া নিউগিনি সম্পর্কিত এই নিবন্ধনটি এ পর্যন্তই।। এই ধরনের আপডেট তথ্য ভিডিও আকারে পেতে “ভিন্ন জনপদ” এর ফেসবুক পেজটি ফলো করে যুক্ত থাকার অনুরোধ রইল। ধন্যবাদ!!


0 Comments